পোশাক খাতে অভিনব জালিয়াতি, ৬শ' কোটি টাকার ক্ষতি

এ যেন হার মানায় সিনেমার গল্পকেও। বছরে মাঝামাঝিতে ২০টি পোশাক কারখানায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ক্রয় আদেশ দেয় ওয়াই অ্যান্ড এক্স নামে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। যার কর্ণধার মনজুর বিল্লাহ নামের এক বাংলাদেশি। পোশাকের দামও ধরা হয় ভালো। যদিও শর্ত ছিলো চীনের নির্দিষ্ট কিছু কারখানা থেকেই কিনতে হবে কাপড় ও আনুষঙ্গিক পণ্য। যার দাম কিছুটা বেশি হলেও মুনাফা খারাপ হবে না ভেবে কেনা হয় প্রায় ৪শ কোটি টাকার পণ্য। কিন্তু ২৮ কন্টেইনার তৈরি পোশাক যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। দিনের পর দিন পণ্য খালাস না হওয়ায় জানা যায় ওয়াই অ্যান্ড এক্স নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই নেই। কিন্তু ততক্ষণে বেহাত কোটি কোটি টাকা। 

 

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার। রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় সাড়ে ৩ শ কিলোমিটার দূরের শহর। এখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যাটাও কম নয়। যাদের একজন মঞ্জুর মোর্শেদ হাফিজ বিল্লাহ। পরিচিতরা চেনেন মঞ্জুর বিল্লাহ নামেই। কাগজে কলমে ব্যবসায়ী। প্রতিষ্ঠানের নাম ওয়াই এন্ড এক্স হোম লিমিটেড। ক্রয়াদেশ দেন পোশাক ব্র্যান্ড জ্যাক সাউথ লন্ডনের নামে। ঠিকানা ইউনিট থ্রি ব্র্যাডস্টোন রোড, ম্যানচেস্টার। তবে অফিস আছে আরো এক দেশে। চীনের গুয়াংজুতে।

প্রতারণার মাধ্যমে দেশের পোশাক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থ আত্মসাতের ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছে এসব নাম। হয়তো যোগ হবে আরো কয়েকটি। এ বছরের জুন থেকে আগস্ট। এই সময়টায় এপকট, মীম, এটিএস, ইউনাইটেড, জ্যারিকো এপারেল, ফারজানা, ইভান্স ও ইমপ্রেস গ্রুপসহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ২০ টির বেশি কারখানায় ক্রয়াদেশ আসে মনজুর বিল্লাহ র ওয়াই এন্ড এক্স হোম লিমিটেড থেকে। যার যোগসূত্র এ এস এম এপারেল , ভ্যানগার্ড ইন্টারন্যাশনাল ও ওয়াই এন্ড এক্স এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির। তৈরি হয় চুক্তি পত্র। সবমিলিয়ে ক্রয়াদেশ প্রায় ৬শ কোটি টাকার।

প্রতিটি পণ্যের জন্যই মিলবে ভালো দাম। তবে শর্ত একটাই। কাপড় ও অন্য কিছু আনুষঙ্গিক পণ্য কিনতে হবে মনজুর বিল্লাহর ঠিক করে দেওয়া বেশ কটি চীনা কারখানা থেকে। কাপড়ের খরচটা কিছু বেশি হলেও লাভের অংকটাও খারাপ নয়। এই বিবেচনায় এসব কারখানা প্রতিটি চুক্তির বিপরীতে খুলে ঋণপত্র। এগুলো খোলা হয় বাংলাদেশের এনসিসি, এক্সিমসহ আরো কয়েকটি ব্যাংকে...আর চীনে ব্যাংক অব চায়না ও হাবিব ব্যাংকে। সবমিলিয়ে দেওয়া হবে প্রায় ৪শ কোটি টাকা। পণ্য বুঝে পেয়ে সম্মতিপত্র দেবার ৯০ থেকে ১২০ দিন পর থেকেই টাকা পাবে চীনা কারখানাগুলো।

কাপড়ও চলে আসে অন্য সময়ের চেয়ে অনেকটা দ্রুতই। দেশে ব্যাংকগুলোকে তাই দেওয়া হয় সম্মতিপত্র। টাকা যেতে আর কোন বাধা নেই। এদিকে জ্যাক সাউথ লন্ডনের জন্য তৈরি হতে থাকে পোশাক। যুক্তরাজ্যে পাঠাতে হবে সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের মধ্যে। পোশাক মালিকদের তাড়াহুড়োও তাই বেশি। এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক। একসময় ভিন্ন ভিন্ন কারখানা থেকে যুক্তরাজ্যে পোছায় ২৮ টি কন্টেইনার ভর্তি তৈরি পোশাক। টাকা পাওয়ার কথা তিন দিনেই। কিন্তু এরপরেই বিপত্তি।

পোশাক গেলেও টাকা পৌছায়না দেশের মালিকদের কাছে। পেরিয়ে যেতে থাকে সময়। দানা বাঁধে সন্দেহ...আর চলে খোজ খবর। একসময় বেরিয়ে আসে ইংল্যান্ডে কন্টেইনার গুলো খালাসের কেউ নেই। মনজুর বিল্লাহ'র প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, শুধু ওখানেই নয়, পুরো ম্যানচেস্টারেই ওয়াই এন্ড এক্স নামে কোন প্রতিষ্ঠানেরই অস্তিত্ব নেই। চীনেও বন্ধ পাওয়া যায় ব্র্যান্ডটির একসময়ের আলিশান অফিস। এ ব্যাপারে কোন পোশাক মালিকই ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও তাদের সংগঠন বিজিএমইএ স্বীকার করে পুরো ঘটনার সত্যতা।

ঘটনা আরো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে চ্যানেল ২৪। যাওয়া হয় ভ্যানগার্ড ইন্টারন্যাশনাল এর বনানীর রোড নম্বর ২৭ এর বাসায়। বাড়ি নম্বর ৪৫। ৫ তলায় অফিস। তবে পাওয়া গেলনা প্রতিষ্ঠানের মালিক ইমাম কে। গেট খুললেন অফিস সহকারি। ভেতরে আছেন মান নিয়ন্ত্রন কর্মকর্তা। কথা হল তার সাথেই। তিনি জানেন না ইমাম কই। 

জোগাড় হল ইমামের নাম্বার। সেটিও বন্ধ।

৩ জন পোশাক মালিক আলাদা আলাদা মামলা করেন বাড্ডা, গুলশান ও উত্তরা থানায়। ধরা পড়ে ওয়াই এন্ড এক্স এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির। তবে ইমাম ছাড়াও খোজ মেলেনি আরেক বায়িং হাউজ এ এস এম এপারেলের মালিক মিজানের এরমধ্যে চীনা কারখানাগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করে দেশের একটি পোশাক কারখানা। যেখানে একটি কারখানা স্বীকারও করে মনজুর বিল্লাহকে পোশাকের বাড়তি দামের অর্থ দেওয়ার। চ্যানেল ২৪ এর হাতে পৌছায় কয়েক মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের ঘটনার কিছু নথি।

যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় ঘটনার মূল হোতা মনজুর বিল্লাহ'র যুক্তরাজ্যের নাম্বারে। প্রথমবার পরিচয় পেয়ে ফোন রেখে দিলেও পরের বার করা হয় দুর্ব্যবহার। মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও মেলেনি কোন উত্তর।

 

Last modified on 13-11-2017 09:06:14 PM

চ্যানেল 24

387 South, Tejgaon I/A
Dhaka-1208, Bangladesh
Email: newsroom@channel24bd.tv
Tel: +8802 550 29724
Fax: +8802 550 19709

Save

Save

Like us on Facebook
Satellite Parameters
Webmail

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save